ইসলামে অপবাদ দেয়া ভয়ানক অপরাধ

অহেতুক খারাপ ধারণা ইসলামে নিষিদ্ধ

আজকের খুৎবায় আমি নিজের উপর কঠিন এক দায়িত্ব অর্পণ করেছি। এমন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছি যা পরিষ্কারভাবে কিছু মানুষকে ক্ষুব্ধ করবে।

শুরুতে কয়েকটি মন্তব্য করতে চাই। যে বিষয়ে আমিসহ সকল মুসলিমের পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। এবং আমাদের নিজেদেরকে বার বার এই কথাগুলো মনে করিয়ে দেওয়া উচিত।

আমরা মুসলিম হওয়ার জন্য দুঃখিত নই। আল্লাহ তাঁর বইতে যা কিছু অবতীর্ণ করেছেন আমরা তার কোনো কিছুর জন্যই ক্ষমা চাইবো না। অথবা রাসূল (স) এর সুন্নায় যার নির্দেশনা রয়েছে, তার জন্যেও ক্ষমা চাইবো না। আমরা কারো কাছে ব্যাখ্যা করার জন্য দায়বদ্ধ নই। আমাদেরকে বিব্রত বা লজ্জিত হতে হবে না। “তোমাদের ধর্মগ্রন্থে অমুক অমুক কথা বলা হয়েছে, কিভাবে তুমি এটা বিশ্বাস করতে পারো? তোমাদের নবী অমুক অমুক কথা বলেছেন, কিভাবে তুমি এটা বিশ্বাস করতে পারো? তুমি কিভাবে এর সাথে একমত হতে পারো?” কিছু মানুষ আমাদের সর্বদা এমন পজিশনে ফেলতে চাইবে। তখন আমাদের মনে হবে, এর একটা জবাব দেওয়া দরকার। কোনো কোনো সময় আমরা উত্তর জানি না। মাঝে মাঝে আমরা আমাদের রাসূল (স) সম্পর্কে বিভিন্ন কথা শুনে থাকবো, বা কুরআন থেকে বিভিন্ন উদ্ধৃতি তুলে এনে কেউ আপনাকে বলবে, এই কথাগুলো তো খুবই বর্বর শোনায়। এই কথাগুলো হিংস্র শোনায়। এই কথাগুলো অমানবিক শোনায় বা অন্যায্য শোনায়। কিভাবে তুমি এর সাথে একমত হতে পারো? তোমরা কি আসলেই এমন জিনিসে বিশ্বাস করো? তোমরা কি মনে করো এগুলো ঠিকাছে?

প্রথমবার এমন কথা শুনলে আপনি হতচকিত হয়ে বলে উঠেন, “না, আমরা আসলে এর সাথে একমত নই।” আপনি কিছুটা পেছনে সরে আসেন। তখন এটা বললে কোনো সমস্যা নেই যে, “আমি আসলে এই বিষয়টা ভালোভাবে বুঝি না।” কিন্তু এভাবে বলা যাবে না যে, “কুরআন-সুন্নায় যদি অমুক কথা আসলেই থেকে থাকে, আমি এর সাথে একমত নই।” কারণ, আমরা দ্বিমত পোষণ করি না। এই বইয়ের সবকিছু, আল্লাহর অবতীর্ণ সবকিছু, আমরা যে শুধু সবকিছু বিশ্বাস করি তাই নয়, যদিও কেউ কেউ অস্বস্তি অনুভব করে… প্রথমত এই রকম অস্বস্তি অনুভব করার কোনো সুযোগ নেই। ثُمَّ لَا یَجِدُوۡا فِیۡۤ اَنۡفُسِهِمۡ حَرَجًا مِّمَّا قَضَیۡتَ – “তাদের অন্তরে যেন কিছু মাত্র কুণ্ঠাবোধ না থাকে, তোমার যে কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাপারে।” (৪:৬৫) ইসলামের অনুসারী হিসেবে আমরা এমনই। এটাই আমাদেরকে মুসলিম বানায়। আমাদের যে শুধু অস্বস্তি থাকে না তাই নয় বরং আমরা আল্লাহর নিকট আনন্দিত, তিনি যতোকিছু অবতীর্ণ করেছেন তার সবকিছুর জন্য।

এই বই আমাদের জন্য অস্বস্তির কারণ নয়, এই বই আমাদের জন্য আনন্দের উৎস। فَبِذٰلِکَ فَلۡیَفۡرَحُوۡا ؕ هُوَ خَیۡرٌ مِّمَّا یَجۡمَعُوۡنَ – “কুরআনের জন্য তারা আনন্দিত হোক…।” (১০:৫৮)

কুরআনের প্রতিটি আয়াত -এটা আমার ঈমানের অংশ, আপনার ঈমানের অংশ- কুরআনের প্রতিটি আয়াতের জন্য আমার দারুণভাবে প্রফুল্ল হওয়া উচিত। আমি এই কিতাবে বিশ্বাস করতে পারার কারণে যারপরনাই আনন্দিত। এই বইয়ে বিশ্বাস স্থাপন করার কারণে আমি গর্বিত। এর প্রতিটি আয়াতের উপর আমার আত্মবিশ্বাস রয়েছে।

নারীদের ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপকারীদের জন্য কঠোর শাস্তির

এটা একটা সমস্যা যখন আমি আর আপনি চিন্তা করতে শুরু করি, “আল্লাহ কুরআনে কিছু কথা বলেছেন যা নিয়ে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। আমি কিভাবে এটা অন্যদের কাছে ব্যাখ্যা করবো। ভাই, কোনো অমুসলিম যদি প্রশ্ন করে আমি সমস্যায় পড়ে যাবো।” আমরা গর্তে লুকিয়ে যাই।

বিষয়টা আমার আপনার জন্য খুবই লজ্জার যে, আমরা জানি না আল্লাহর বইতে কী বলা আছে। আর যখন আমরা জানি না আল্লাহর বইতে কী বলা আছে, তখন আমরা তা আর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি না।

সর্বপ্রথম এই ব্যাপারটা আমি আপনাদের দৃষ্টিগোচর করতে চেয়েছিলাম। আজকের আলোচ্য বিষয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার পূর্বে।

দ্বিতীয় যে বিষয়টার প্রতি আমি আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই- এ বইটি শুধু হেদায়েতের বই নয়, এটি স্বাভাবিক মানব প্রকৃতির বইও বটে। (ফিতরাহ-র বই)। আল্লাহ এ বইটি মানব জাতির উপকারার্থে নাজিল করেছেন। বস্তুতঃ এমনকি জিনেরাও এই কিতাব থেকে উপকৃত হতে পারে।

আর তিনি যেহেতু এই বই অবতীর্ণ করেছেন তিনি একেবারে ভালো করেই জানেন কার কাছে এই বই পাঠানো হচ্ছে। তিনি ঠিক এমন এক সৃষ্টির কাছে এটি পাঠাচ্ছেন যাদেরকে তিনি নিজেই সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন- اَلَا یَعۡلَمُ مَنۡ خَلَقَ – “যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না?” (67:14) আল্লাহ আমাকে আপনাকে কোনো নির্দেশনা দিবেন না, আমরা আসলে কে তা জানার পূর্বে। আর আমরা নিজেদের সম্পর্কে যতটুকু জানি তিনি তারচেয়েও বেশি জানেন।

জানেন? কেউ কোনো উপদেশ দিলে আপনি হয়তো বলে উঠেন- “উনি যদি আমার অবস্থা ভালোভাবে জানতেন তাহলে হয়তো ভিন্নরকম উপদেশ দিতেন।” কখনো কখনো আপনার খুব ব্যস্ত সময়ে আপনার বস হয়তো কিছু করতে বলে। তখন মনে মনে ভাবেন- “এই মুহূর্তে আমার হাতে অন্য অনেক কাজ পড়ে আছে। উনি সেগুলো সম্পর্কে জানেন না। যদি উনি আমার অবস্থা পুরোপুরি জেনে ইন্সট্রাকশন দিতেন তাহলে হয়তো তার ইচ্ছের পরিবর্তন ঘটতো। তার সাথে আপস করার একটা সুযোগ তৈরি হত।” কেউ জানে না আপনি কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, জীবন কিভাবে কাটছে, পরিস্থিতি কেমন যাচ্ছে, কেমন সামর্থ্য আছে আপনার; আল্লাহ চেয়ে ভালো কেউ জানে না।

আর সে আল্লাহ-ই আমাকে আপনাকে কুরআনের এই নির্দেশনাগুলো দান করেছেন। সুতরাং, তিনি যথাযথভাবেই জানেন তিনি কার সাথে কথা বলছেন এবং কী বলতে হবে। এই নির্দেশনাগুলো সমগ্র মানব জাতির জন্য যথাযথ এবং নিখুঁত। এটা আমার বিশ্বাসের অংশ।

আমার এভাবে চিন্তা করা যে, আল্লাহ এমন কিছু বলবেন যাতে আমার নিজের কোনো উপকার নেই- এমন চিন্তা আমার বিশ্বাসের বিপরীত। আল্লাহ কখনোই আমাকে আপনাকে কিছু করতে বলবেন না, যদি না তাতে আমাদের জন্য উপকার থাকে। এই বইটি আমাদের জন্য আল্লাহর এক বিশাল অনুগ্রহ। আল্লাহর নিকট থেকে আমাদের জন্য রাহমা। এ জন্যই তিনি বলেছেন- “আর রাহমানু আল্লামাল কুরআন।” আল্লাহর সকল নামের মধ্য থেকে এই নামটি কুরআন শেখানোর সাথে যুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলতে পারতেন- আল-আজিজ আল্লামাল কুরআন। কর্তৃত্বশালী কুরআন শিখিয়েছেন। যেন আমরা কুরআনকে নিজেদের উপর কর্তৃত্বশালী একটি বই হিসেবে গ্রহণ করি।

কিন্তু, না। তিনি এমন একজন শিক্ষক হিসেবে নিজের পরিচয় দিয়েছেন যিনি হলেন আর-রাহমান। অতিশয়, বিস্ময়করভাবে দয়ালু, স্নেহপরায়ণ এবং কল্যাণকামী। তিনিই কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। অতএব তিনি যখন শেখাচ্ছেন, শেখাচ্ছেন ভালবাসা থেকে, কল্যাণকামীতা থেকে এবং দয়া থেকে। তাই, বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো বিধানকে বেশ কঠোর মনে হলেও বস্তুতঃ এটাও আমাদের জন্য একটি রহমত।

মিথ্যা অপবাদ দেওয়া জঘন্য অপরাধ

এই ব্যাপারগুলো মনের মাঝে গেঁথে নেয়ার পর…আজ আমি আপনাদের সাথে যা শেয়ার করতে চাই তা হলো- আহকাম তথা আল্লাহর বিধানগুলো, আল্লাহর শাসনপদ্ধতিগুলো, আল্লাহর আদেশ-নিষেধগুলো– যখন আমরা এগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে না জানি, তখন এগুলোকে কঠোর মনে হতে পারে। কিন্তু যখন বিধানগুলো ভালোভাবে জানবেন… আর এই নিয়তে শেখার চেষ্টা করবেন না যে, আপনি এগুলো আরেকজনকে ভালোভাবে বুঝাতে চান। আপনি এগুলো শিখবেন নিজের জন্য। ঐটা ভুল নিয়ত কোনো কিছু শেখার জন্য।

তাই, এখন আমি যা শেয়ার করতে চাই তা এইজন্য নয় যে, যেন আপনার অমুসলিম কলিগকে ব্যাপারটা ভালো করে বুঝাতে পারেন। প্রথমতঃ তাদের নিকট আমাদের ধর্মের সবকিছুর যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে আমরা বাধ্য নই। আমরা ব্যাপারগুলো নিজেরা নিজেদের জন্য ভালোভাবে বুঝতে চাই। কারণ, আল্লাহর বইকে আরও ভালোভাবে বুঝতে আমি নিজেই নিজের কাছে বাধ্য। যখন এই কাজটি আগে সম্পন্ন করবো, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমাদের অন্তরে এমন একটি বাসনা তৈরি হবে যে, আমরা এর কল্যাণ অন্যদের সাথে শেয়ার করতে চাইব।

যদি শুধু এই একটি কারণে ইসলাম শিখতে চান- মানুষের কাছে এর প্রচার-প্রসার- এতে সমস্যা আছে। এটা ইসলাম শেখার কারণ হতে পারে না। যেন অমুসলিম বন্ধুদের কাছে আপনাকে লজ্জায় পড়তে না হয়। এটা কারণ হতে পারে না।

ইসলামে কাউকে অপবাদ দেওয়ার শাস্তি

এখন, আলোচ্য বিষয়ে আবার ফিরে আসছি। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লার নাযিলকৃত আহকামগুলো, শাসনপদ্ধতিগুলো, আইনগুলো ও নির্দেশনাগুলো সরাসরি মানব প্রকৃতির কাছে আবেদন জানায়। কারণ, আল্লাহ জানেন তিনি কাকে সৃষ্টি করেছেন এবং কার প্রতি নির্দেশনাগুলো জারি করছেন। তাই, আমরা যখন আল্লাহর বিধানগুলো বুঝতে পারি, আল-কুরআনের অভিমতে- সেগুলো তখন আমাদের প্রকৃতির সাথে মিলে যায়।
আপনার ভেতরে কিছু একটা আছে, একটা চৈতন্য আপনার ভেতরে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, আপনার ভেতরে যে ফিতরাহ আল্লাহ রেখে দিয়েছেন…যখন আল্লাহর বিধাগুলো বুঝতে পারেন অস্বস্তি লাগার কথা ভুলে যান, আপনি তখন বলে উঠবেন- ওয়াও, এটা তো পুরোপুরিই যৌক্তিক। ব্যাপারটা কি অসাধারণ প্রজ্ঞাময়! কি অসাধারণ সুন্দর!
কিন্তু আমরা যদি এইরকম উপসংহারে পৌঁছতে সক্ষম না হই, সম্ভবত এখনো আমরা যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করিনি আল্লাহর আহকামগুলো নিয়ে, বিধি-বিধানগুলো নিয়ে, শাসনপদ্ধতিগুলো নিয়ে। অন্যদিকে, সম্ভবত আমাদের অন্তরে ময়লা জমা হয়ে গেছে। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদেরকে উভয়টি দান করুন- আল্লাহর বইয়ের ভালো বুঝ এবং পরিশুদ্ধ অন্তর।
তো, আল-কুরআনে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে অশুদ্ধ আলোচনাগুলোর একটি হলো নারী-পুরুষের ব্যভিচারের শাস্তি; সে শাস্তিটা হলো তাদেরকে বেত্রাঘাত করো। فَاجۡلِدُوۡا کُلَّ وَاحِدٍ مِّنۡهُمَا مِائَۃَ جَلۡدَۃٍ ۪ – তাদেরকে কশাঘাত করো বা চাবুক দিয়ে পিটাও একশ বার। (২৪:২)
তো, খ্রিস্টানরা যখন ব্যঙ্গ করে বলে- ব্যভিচারী এবং ব্যভিচারিণীকে কুরআন ১০০ বার চাবুক দিয়ে পেটাতে বলেছে। কি রকম এক বর্বর আইন এটা!
আমরা তখন ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাই- “না, না, এখন আসলে আধুনিক যুগ। সমাজের অবস্থা এখন ভিন্ন। এতে সমস্যা নেই। যুগ পাল্টে গেছে।” কী!! একটু থামুন। আল্লাহর এই বই কালজয়ী। আল্লাহ কী বলেছেন আগে তা ভালো করে বুঝুন। অন্যের কাছে এটা ব্যাখ্যা করার পূর্বে।
ইবনে আশুর (র) اَلزَّانِیَۃُ وَ الزَّانِیۡ শব্দদ্বয়ের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যা আয়াতের শুরুতে এসেছে- যেহেতু ইসেম বা নাউন ব্যবহার করা হয়েছে এটা ইঙ্গিত করে যে, এ বিধান ঐ সমস্ত মানুষদের জন্য যারা সবসময় বারবার ব্যভিচার করতে থাকে। এখানে পতিতাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। যারা অবৈধ দেহ ব্যবসার সাথে জড়িত এখানে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে; সবার আগে। আগেকার যুগের আলেমরা এটা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। এটা তো আর এখন অবতীর্ণ হয়নি। প্রাচীনকালের বড় বড় আলেমরা এই আয়াতের প্রসঙ্গ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এখানে কাদের সম্পর্কে বলা হচ্ছে।
আর এটা মদিনার অন্যতম একটি বড় সমস্যা ছিল, রাসূলের আগমনের পূর্বে। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এখন, রাসূল (স) মদিনাতে এসেছেন তবু সমস্যাটি চলতে থাকলো। তাই, কুরআনকে এই শহরে আগে থেকে চলে আসা একটি সমস্যা নিয়ে মন্তব্য করতে হয়। সমস্যাটা এতোই প্রকট ছিল যে… এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, এখানে উপস্থিত সবাই জেনে থাকবেন যে, চারজন সাক্ষী উপস্থিত করা ছাড়া ব্যভিচারের শাস্তি দেওয়া যায় না। আপনারা সবাই এটা শুনে থাকবেন হয়তো। চারজন সাক্ষী থাকতেই হবে।
এখন, মাথায় সামান্যতম বুদ্ধি আছে এমন যে কোনো মানুষ এটা বুঝবে যে, চারজন ব্যক্তি সামনে রেখে কেউ কখনো এমন কাজ করে না। চারজন সাক্ষীর সামনে এ কাজ কেউ করবে না। চারজন সাক্ষী থাকার একমাত্র সম্ভাব্য ক্ষেত্রে হলো আপনি যদি রাস্তা ঘাটে জনসম্মুখে এই অপকর্ম করেন। আধুনিক আইনের ভাষায় যাকে বলে “জনসম্মুখে অশ্লীল কার্যকলাপ”।
অনেক দেশে এ ধরণের আইন রয়েছে। “জনসম্মুখে অশ্লীল কার্যকলাপ” প্রতিরোধে আইন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, এ ধরণের কিছু যদি এখানকার রাস্তায় ঘটে, টেক্সাসের আইন রয়েছে এদেরকে গ্রেফতার করার এবং শাস্তি দেওয়ার। এহেন অপকর্ম যদি বিমানে ঘটে, তখনো আইন রয়েছে কয়েক বছর জেলে কাটাতে হবে।
অতএব, এটা ইসলাম কর্তিক নতুন কিছুর প্রবর্তন নয়। এমন নয় যে, ইসলাম এটা নতুনভাবে এনেছে, আগে কেউ কখনো এমন আইনের কথা শোনেনি। বস্তুত এই পৃথিবীর সকল সভ্য জাতির “জনসম্মুখে অশ্লীল কার্যকলাপ” প্রতিরোধে আইন রয়েছে। তাদের আছে। আর তাই কুরআনেরও আছে। কারণ, কুরআন একটি নতুন সভ্যতার উন্মেষ ঘটাতে যাচ্ছে। ঈমানদারদের নিয়ে একটি নব সভ্যতার জাগরণ ঘটাতে যাচ্ছে।
আর জনসম্মুখে অশ্লীল কার্যকলাপ ছোট কোনো অপরাধ নয়। কারণ, এমন অপকর্ম যদি সবার সামনে রাস্তাঘাটে ঘটতে থাকে, যেখানে চারজন ব্যক্তি পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অনায়াসে দেখতে পায়। তখন বাচ্চারা পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে পারে, নির্দোষ শিশু কিশোরেরা হেঁটে যেতে পারে যারা জীবনে কখনো এমন চিত্রের মুখোমুখি হয়নি। আর এটা মানসিকভাবে তাদের চরম ক্ষতি সাধন করতে পারে। এমন একটি ভিত্তি নষ্ট করে দিবে পারিবারিক জীবন ব্যবস্থার একেবারে মূলে যার অবস্থান। এটা মানুষের মাথা নষ্ট করে দিবে।
এমন কিছু যা গোপন থাকার কথা আপনি যদি তাকে সর্ব সাধারণের সামনে উন্মুক্ত করে দেন তখন এটা মানুষকে নষ্ট করে ফেলে। তাদের চিন্তাভাবনা দূষিত করে দেয়।

 

মিথ্যা অপবাদ থেকে মুক্তির দোয়া

চলুন, কিছুটা পেছনে সরে এসে একটা বিষয় বোঝার চেষ্টা করি। আমরা এমন এক কঠিন সময়ে বাস করছি, জেনার জন্য চারজন সাক্ষীর কথা ভুলে যান, আপনি এখন চার মিলিয়ন সাক্ষীও জোগাড় করতে পারবেন। কারণ পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রি, নোংরামির ইন্ডাস্ট্রি ব্যভিচার বিক্রি করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে। ইন্টারনেটে বিপণনকারীরা বাঁশের লাঠি থেকে শুরু করে তোয়ালে পর্যন্ত যে কোনো কিছু বিক্রি করতে পারে। জানেন? সবচে সফল ইন্টারনেট প্রডাক্ট কী? পর্ণোগ্রাফি ইন্ডাস্ট্রির প্রডাক্ট। ইন্টারনেট মার্কেটিং-এ তারাই লিডার।

যদি ইন্টারনেট মার্কেটিং-এর কোনো সেমিনারে যোগ দেন, দেখবেন ইন্ডাস্ট্রিতে সবচে সফল ব্যক্তি, নিজের বিনিয়োগ থেকে যে সবচে বেশি উপার্জন করে, সে হলো ঐ ব্যক্তি, যে অনলাইনে জেনা-ব্যভিচার বিক্রি করে বেড়ায়। ওরাই একেবারে সবার আগে থাকে। তো, ব্যাপারটা এখন সম্পূর্ণরূপে মানুষের চোখের সামনে।

আর ব্যাপারটা যখন এতোটাই জনসম্মুখে বর্তমান, কল্পনা করতে পারেন এগুলো কী পরিমাণ ক্ষতি সাধন করে মানুষের মন-মানসিকতায়!! যারা এগুলো দেখে। কী পরিমাণ ক্ষতি এটা ইতোমধ্যে করে ফেলেছে! কত লক্ষ কোটি শিশুরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে! কত কিশোর-কিশোরীর মন-মানসিকতা নষ্ট করে দিয়েছে এ অসভ্যতা!! কত শত বিবাহ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে!! এই নোংরা চিত্রগুলো জনসম্মুখে ভেসে বেড়ানোর কারণে।

এই অসভ্য চিত্রগুলো চোখের সামনে না এসে পড়াটা এখন কতটা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে!! যত চেষ্টাই আপনি করেন না কেন। কারণ অগণিত অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে এটা নিশ্চিত করার জন্য যে, আপনি যেন এরকম কিছু একটা দেখতে বাধ্য হোন।

তাই, কুরআন এসে বলছে এটা খুবই সংকটজনক এক সমস্যা। যার রয়েছে খুবই ক্ষতিকর এবং ধ্বংসাত্মক প্রভাব। মানুষের বুদ্ধিতে জট পেকে যাবে। এগুলো তাদের চিন্তা-ভাবনাগুলো গুলিয়ে ফেলবে, মাথা নষ্ট করে দিবে। তাদের দ্বারা এমনসব অপরাধ সংঘটিত হবে যা এমনকি বুঝেও আসবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কী পরিমাণ জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয় শিশুদের বিরুদ্ধে!! কী পরিমাণ যৌন নির্যাতনমূলক অপরাধ সংঘটিত হয়!! প্রতি মিনিট পর পর পুলিশের কাছে কী পরিমাণ রিপোর্ট আসে!!

এমন ধরণের অপরাধ ঘটতে থাকে যখন আপনি বারবার বারবার এসব জঘন্য চিত্রের মুখোমুখি হয়ে পড়েন। এরপর এটা সমাজের স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়ায়।

তাই, কুরআন এগিয়ে এসে বলে- না, কেউ যদি জনসম্মুখে এমন নির্লজ্জ অপরাধ করে বসে তখন তোমাদেরকে অবশ্যই তাকে শাস্তি দিতে হবে।

চলুন, এখন এর শাস্তি নিয়ে কথা বলি…। তাদের হত্যা করতে বলা হয়নি। তাদের চাবুক পেটা করতে বলা হয়েছে। একশ বার। আর যখন তাদের একশবার চাবুক পেটা করা হয়, আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা শুধু বলেননি চাবুক পেটা করো। এতেই সমস্যা শেষ।

ইসলামী আইনবিদেরা, এই দ্বীনের বড় বড় আলেমেরা, সাহাবারা সুদীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করতেন কিভাবে এই মানুষগুলোর সমস্যার সমাধান করা যায়। প্রসঙ্গত, এ ধরণের মানুষদের শাস্তির কথা আল্লাহ শুধু কুরআনের এই এক জায়গায় বলেননি। সূরাতুন নূরের আগেও আরও আয়াত এসেছে, সূরাতুন নূরের বেশ পূর্বে সূরাতুন নিসায়। সূরাতুন নিসায় এসেছে- وَ الَّذٰنِ یَاۡتِیٰنِهَا مِنۡکُمۡ فَاٰذُوۡهُمَا – “আর তোমাদের মধ্য থেকে যে দু’জন অপকর্ম করবে…” (৪ঃ ১৬)

কোনো লোক ইসলাম গ্রহণ করলো সেসময়ের মদিনাতে। সে ইসলাম গ্রহণ করলো। বা কোনো মেয়ে ইসলাম গ্রহণ করলো। কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে তারা বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড ছিল। তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ছিল না। বিয়ে ছাড়া যে এমন সম্পর্ক স্থাপন করা যাবে না তারা তা জানতো না। কারণ, তারা মুসলিম ছিল না। এখন হঠাৎ করে তারা ইসলাম গ্রহণ করে ফেলল। শাহাদা গ্রহণ করার পর এক রাতের মধ্যেই তারা বিশাল ধার্মিক হয়ে গেছেন ব্যাপারটা এমন নয়। তারাও মানুষ ছিলেন। তাঁরা ধীরে ধীরে ধার্মিক হয়ে উঠছেন। যেমন আল্লাহ নিজেই বলেছেন- لَتَرْكَبُنَّ طَبَقًا عَن طَبَقٍ – (ভাবানুবাদ) তোমরা অল্প অল্প করে নিজেদের উন্নত করে তুলবে। (৮৪:১৯)

মিথ্যা অপবাদ নিয়ে উক্তি
তাই, আল্লাহ এমনকি এমন ধরণের দৃশ্যপটের কথাও আলোচনা করেছেন যেখানে কোনো মুসলিম— রাসূলের মাদানী জিন্দেগির একেবারে শুরুর দিকে— এমনকি কোনো মুসলিমও হয়তো এ ধরণের কোনো ভুল কাজ করে ফেলতে পারে। কোনো যুবক ছেলে নফসের তাড়নায় বিয়ে ছাড়াই কিছু একটা করে ফেললো। সে এখনো বিয়ে করেনি, কিন্তু একটি মেয়ের সাথে সে কিছু একটা করে ফেললো। এখন, এদেরকে নিয়ে কী করবেন? কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হলো যা এই আয়াতগুলো দ্বারা মানসুখ(হুকুম বাতিল) হয়ে গেছে— অনেক আলেমের অভিমতে।

তাদের জন্য কোন ধরণের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছিল? وَ الَّذٰنِ یَاۡتِیٰنِهَا مِنۡکُمۡ – “আর তোমাদের মধ্য থেকে যে দু’জন অপকর্ম করবে فَاٰذُوۡهُمَا – তাদেরকে শাস্তি প্রদান কর।” (৪ঃ ১৬) কিভাবে শাস্তি দিতে হবে তা আল্লাহ বলেননি। তিনি শুধু বলেছেন তাদেরকে শাস্তি প্রদান করো।

তো, সাহাবারা এটা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনায় লিপ্ত হতেন। ইবনে আব্বাস (রা) এবং কয়েকজন সাহাবা বলতেন- আল্লাহ হয়তো এখানে তাদেরকে বকাঝকা করার কথা বলেছেন। তাদের ডেকে এনে ধমক দিয়ে বল- “কিভাবে তোমরা এমন কাজ করতে পারলে!! তোমাদের লজ্জা থাকা উচিত।” তাদেরকে কষ্ট দেওয়ার মানে হলো এটাই। অন্য কেউ বলতেন— আমাদের উচিত একটি লাঠি দিয়ে তাদের পায়ের নিম্নাংশে পেটানো; দশবারের মত। তখন এটাই হবে তাদেরকে কষ্ট দেওয়া।

তাদেরকে চাবুক পেটা বা কাটা-ছেঁড়ার করার কথা কেউ চিন্তাও করেনি। উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখার বা পাথর মারার কথাও কেউ চিন্তা করেনি। না, না, না। তখনো এ ধরণের কোনো বিধান আসেনি। তারা যুবক বয়সের তাড়নায় একটি ভুল করে ফেলেছে, ব্যাপারটাকে সহজভাবে গ্রহণ করুন। তারা মাত্র কিছুদিন হলো ইসলাম গ্রহণ করেছে। ভুল কাজটা ঘটে গেছে। ঠিকাছে, তাদের তিরস্কার করতে হবে।

প্রসঙ্গত, এটা কুরআনেরই বিধান। “فَاِنۡ تَابَا وَ اَصۡلَحَا فَاَعۡرِضُوۡا عَنۡهُمَا – অতঃপর যদি তারা তাওবা করে এবং বলে যে, আমরা আর কখনো এমন কাজ করবো না বা যদি তাদের বিয়ে হয়ে যায়- তবে তাদেরকে ছেড়ে দাও। এটা নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করতে যেও না। فَاَعۡرِضُوۡا عَنۡهُمَا – তাদের উপেক্ষা করো, তাদের ব্যাপারে নিবৃত্ত হও। اِنَّ اللّٰهَ کَانَ تَوَّابًا رَّحِیۡمًا – “নিশ্চয় আল্লাহ অতিশয় তাওবাহ কবূলকারী, পরম দয়ালু।” তাদেরকে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে আর বাধা দিও না। তারা বড় একটি ভুল করেছে, হ্যাঁ। কিন্তু, এখন তাদেরকে অন্য সবার মত স্বাভাবিকভাবে চলতে দাও। তাদেরকে আর অপমানিত করো না। যা করার তা ইতোমধ্যে করেছ।

পরবর্তীতে যখন শাস্তির আয়াত অবতীর্ণ হয়…প্রসঙ্গত, এমনকি তখনো চার জন সাক্ষীর প্রয়োজন ছিল। প্রসঙ্গত, তখনো চার সাক্ষীর শর্ত ছিল।

তো, পরবর্তীতে… আরও কঠোর বিধান অবতীর্ণ হয়। যদি এরপরেও কিছু ঘটে চাবুক পেটা করতে হবে। কশাঘাত করতে হবে। কিভাবে তা করা হবে? হয়তো ভাবছেন, চামড়ার তৈরি বিশাল এক চাবুক নিয়ে খটাশ খটাশ আঘাত করা হবে। ফলে মানুষটার পিঠ থেকে চামড়া ছিঁড়ে রক্ত বের হবে, এরকম কশাঘাত চলবে একশো বার। দশ বারের মাথায় লোকটা হয়তো মরেই যাবে।

না, না, না। একটু থামুন। ইসলামী আইনবিদগণ এটা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। তারা বলেছেন- অতি গরম কোনো দিনে চাবুক মারা যাবে না বা অতি শীতের দিনেও নয়। কারণ, চামড়া তখন বেশি স্পর্শকাতর থাকে। রোদের মধ্যে দাঁড় করিয়েও নয়। কারণ, আল্লাহ তাদেরকে এমন শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছে করেননি। যে ব্যক্তি চাবুক পেটা করবে তার বগল যেন দৃষ্টিগোচর না হয়। সে যেন এভাবে পূর্ণ শক্তিতে না পেটায়। কারণ, আমরা মনে করি শাস্তি যেহেতু দিতে হবে, তাই বিশাল দেহের অধিকারী মানবরূপী কোনো দানবকে নিয়ে আসতে হবে; সে কঠোরভাবে পেটাতে পারবে।

না, না। মূল উদ্দেশ্য এটা নয়। বস্তুত, এ শাস্তি অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। ইসলামের ইতিহাসে এ শাস্তি বাস্তবায়িত হয়েছিল মাত্র… প্রসঙ্গত, ইসলাম মহাদেশের পর মহাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। আপনারা জানেন সেটা। গত ১৪/১৫শ বছর যাবত কোটি কোটি মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। গোটা সময়টা জুড়ে সম্ভবত ৩/৪ চারবার এমন ঘটনা ঘটার রেকর্ড পাওয়া যায়। আর শাস্তি কার্যকর করার মত একটা উপলক্ষ্যও তৈরি হয়নি। এটা ইসলামের ইতিহাস! মহাদেশের পর মহাদেশ জুড়ে!

কিন্তু, যদি কখনো শাস্তি দেওয়ার মত উপলক্ষ্য তৈরি হয়, মনে রেখো চাবুক মারার সময় বগল যেন দৃষ্টিগোচর না হয়। শরীরের কোনো জায়গায় আঘাত করলে যদি তা প্রাণঘাতী হয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, সেখানে আঘাত করো না। যদি আঘাতের ফলে শরীরের কোনো অংশ ফেটে যায়, দ্বিতীয়বার সেখানে আঘাত করো না। মুখে আঘাত করো না। স্পর্শকাতর কোনো স্থানে আঘাত করো না। এভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ নির্দেশনা বলে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু, এটা আসলে আমার খুৎবার মূল বিষয়বস্তু নয়। এই শাস্তি ব্যাখ্যা করার জন্য আজকের খুৎবার অবতারণা করা হয়নি। ব্যাপারটা হলো- আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জনসম্মুখে অশ্লীল কাৰ্যকলাপ বড় ধরণের অপরাধ। কারণ, এটা সমাজ নষ্ট করে ফেলে। তাই এর জন্য শাস্তি দিতে হবে।

এখানে মূলনীতি হলো, মূলনীতিটা হলো…বিভিন্ন ধরণের পাপ রয়েছে। কিন্তু, আপনি যদি এমন ধরণের পাপে নিমজ্জিত হোন যা সমাজ নষ্ট করে ফেলে, তাহলে এই দুনিয়াতেই আপনাকে এর জন্য শাস্তি পেতে হবে।

আমি-আপনি এমন অনেক পাপ করি যা শুধু আমাদের নিজেদের ক্ষতি করে। এতে শুধু আমরা ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই। আর এর জন্য কিয়ামতের দিন আমাদেরকে আল্লাহর নিকট জবাব দিতে হবে। আমাদের সেজন্য এ পৃথিবীতে শাস্তি দেওয়া হয় না। শরীয়ত আপনার জন্য কোনো শাস্তি নির্ধারণ করে না, এই দুনিয়াতে। কারণ ক্ষতিটা শুধু আপনার নিজের বা পরিবারের মধ্যে সীমিত। এমন কিছু।

কিন্তু আপনি যখন এমন কোনো অপরাধ করেন যা অন্যদের যন্ত্রণা দেয়, অন্যদের ক্ষতি করে, সমাজ নষ্ট করে ফেলে- তখন ইসলামে এর জন্য সামাজিক শাস্তির বিধান রয়েছে।

আপনার সব কাজের জন্য আল্লাহ আপনাকে শাস্তি দিয়ে আগ্রহী নন। আমাদের ধর্ম এমন নয়। আপনি অন্য কিছুর সাথে এর তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন।

———-
এখন, যদি এ ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হোন…তাহলে আমার আজকের খুৎবার একেবারে মূল বিষয়বস্তুটা শুনুন- খুবই সামান্য কিছু সময় আর বাকি আছে- যে বিষয়টা আমি বোঝাতে চাই, কতবার চাবুক পেটা করতে হবে? একশ বার। এরপর আল্লাহ আরেকটি অপরাধের কথা উল্লেখ করেন যা প্রায় এই জেনার মতই জঘন্য। প্রায় জেনার মতই খারাপ। কারণ, সে অপরাধের জন্য আশি বার চাবুক পেটা খেতে হবে। আশি বার।

ব্যবহারিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, কাউকে যদি একশো বার কশাঘাত করা হয় এবং অন্য একজনকে আশিবার, এর মাঝে আসলে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। কে ঐখানে বসে বসে গুনবে। উভয় ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা অপমানজনক। উভয় ক্ষেত্রেই বিব্রতকর।

প্রসঙ্গত, আমি পূর্বের আয়াতের শেষাংশ উল্লেখ করিনি যখন চাবুক পেটা করা হচ্ছে। আল্লাহ বলেন- وَ لۡیَشۡهَدۡ عَذَابَهُمَا طَآئِفَۃٌ مِّنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ – সবার আগে- وَّ لَا تَاۡخُذۡکُمۡ بِهِمَا رَاۡفَۃٌ فِیۡ دِیۡنِ اللّٰهِ – “আল্লাহর আইন কার্যকর করার ব্যাপারে তাদের প্রতি দয়ামায়া তোমাদেরকে যেন প্রভাবিত না করে।” (24:2) অন্য কথায়- এমনকি যে ব্যক্তি শাস্তি কার্যকর করে, এমনকি যে ব্যক্তি চাবুক উত্তোলন করে তারও খারাপ লাগে এবং বলে- ‘আমি এটা করতে চাই না।’ আর আল্লাহ বলছেন আমি জানি তুমি এটা করতে চাও না। কিন্তু তবু তোমাকে এটা করতে হবে। আল্লাহ তাকে কঠোর হতে বলছেন না। আল্লাহ তাকে বলছেন আমি স্বীকার করে নিচ্ছি তোমার পাপী মুসলিম ভাইয়ের জন্য তোমার দরদ রয়েছে।

আমরা এ আয়াত থেকে শিখছি- এমনকি যে মানুষেরা এমন জঘন্য কাজ করে, জনসম্মুখে, এমনকি সেসব মুসলিম ভাই-বোনদের জন্যেও আমাদের মনে এতো বেশি ভালোবাসা এবং রাহমা রয়েছে যে, আমরা এমনকি তাদেরকে শাস্তিও দিতে পারি না তাদের প্রতি ‘রাহমা’ এবং ‘রা’ফা’ (দয়া এবং স্নেহ) অনুভব করা ছাড়া।

কিছু মানুষ মনে করে, “আমি যেহেতু শরিয়া প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি চাবুক পেটা করার জন্য আমার আর তর সইছে না। যাকে মারবো তাকে মারার মত মারবো। এর মানেই হলো ‘ইকামাতুল হুদুদ’।” কোন কুরআন অধ্যয়ন করছ তুমি? অন্যদিকে আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা তোমার নিকট বর্ণনা করছেন- তোমার মুসলিম ভাই/বোনের জন্য তোমার অন্তরে ইতোমধ্যেই অনুকম্পা রয়েছে। তোমাকে এখন সেটা ভুলে কঠিন কাজটা করতে হবে। কারণ তোমার একজন মুসলিম ভাইকে শাস্তি দিতে হবে।

এ কথা বলার পর তিনি আরও বলেন- “একদল মু’মিন যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” যে কোনো ধরণের ঈমানদার নয়। ‘মু’মিন’ মানে পরিপক্ব ঈমানদার। “আর রাসিখুনা ফিল ইল্মে ওয়াল ঈমান”- নিজেদের বিশ্বাসে যারা অত্যন্ত মজবুত। তিনি এভাবে বলেননি ‘আল্লাজিনা আমানু’। তিনি বলেছেন- মু’মিনিন।

সুতরাং, পরিপক্ব ঈমানদারদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। তাহলে, পরিপক্ব ঈমানদারেরা তথা ইবাদাতকারিরা, আধ্যাত্মিক দিক থেকে পূর্ণতাপ্রাপ্তরা, বয়স্ক মানুষেরা, প্রজ্ঞাবান মানুষেরা এই শাস্তি প্রত্যক্ষ করছে। কেন? কেন তাদেরকে দেখতে হবে? এটা দেখার জন্য তো যুবক ছেলে-মেয়েদের নিয়ে আসা উচিত। “এই যে তোমরা ভুলেও এ কাজ করতে যেও না। করলে কেমন শাস্তি পেতে হবে দেখতে পাচ্ছ তো?” কিন্তু আল্লাহ এটা বলেননি। আল্লাহ বলেছেন মুমিনদের নিয়ে এসো।

ইবনে কাইয়েম সহ বড় বড় আলেমরা এ ব্যাপারটা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। যে কারণে মুমিনদের নিয়ে আসা উচতি— শাস্তি পাওয়ার এই মুহূর্তে যেন মুমিনরা এই শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্য দোআ করতে থাকেন। কারণ, সে তো এখনো মৃত্যু বরণ করেনি। এখনো সে জীবিত। আল্লাহ যদি তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করে ফেলতেন তাহলে তাকে আর নিঃশ্বাস নিতে দিতেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত তার নিঃশ্বাস চালু আছে, তার জন্য তাওবার দরজা খোলা আছে। তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত তো সে এ দুনিয়াতেই করে ফেলছে। এখন, মানুষের দোআ তার কাজে আসতে পারে। “ইয়া আল্লাহ! তাকে ধৈর্য দান করুন। তাকে তাওবা দান করুন। তার তাওবা কবুল করে নিন। সে যেন সামনের দিনগুলো ভালভাবে পার করতে পারে। আখিরাতে তাকে উত্তম পরিণতি দান করুন।”

যারা এ শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে তারা ঠিক এভাবে দোআ করবে। বিদ্রূপ করা দর্শনার্থীদের কাজ নয়- “দেখেছো! যেমন কর্ম তেমন ফল!” তাদের কাজ এটা নয়। কুরআনের শিক্ষা এমনই। তো, এটা গেলো ১০০ টি বেত্রাঘাতের বিবরণ।

কিন্তু, কোন অপরাধের জন্য আশিটি বেত্রাঘাত? আমার শরীরে কম্পন এসে গিয়েছিল, যখন এটা পড়ছিলাম। আল্লাহর কসম! আমি কেঁপে উঠেছিলাম। “ওয়াল্লাজিনা ইয়ারমুউনাল মুহসানাত…” যারা…আমি প্রথমে একটু খারাপভাবে অনুবাদ করছি। “যারা ভদ্র মেয়েদের বিরদ্ধে অপবাদ দেয়।” যারা ভালো মেয়েদের প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে। এটা সর্বোত্তম অনুবাদ নয়, কিন্তু আপনারা কিছুটা ধারণা পাবেন যে আয়াতটি কী নিয়ে কথা বলছে।

আচ্ছা, আল্লাহ কোন ধরণের ভাষা ব্যবহার করেছেন তা বলছি। আল্লাহ বলেছেন, যারা কিছু নিক্ষেপ করে, ইয়ারমুওনা, যারা কিছু নিক্ষেপ করে এমন নারীদের বিরুদ্ধে যারা পরিবারের নিরাপত্তার বেষ্টনীতে রক্ষিত, মুহসনাত মানে ক্যাম্পের ভেতরের নারীরা, দুর্গের ভেতরের নারীরা। আল্লাহ পরিবারকে এক ধরণের প্রতিরক্ষা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাই, তারা মা হউক, মেয়ে হউক, বোন হউক, স্ত্রী হউক তারা সবাই মুহসনাত। সবাই সুরক্ষিত।

এ সমস্ত নারীরা যারা একটি পরিবারের অংশ, কেউ যদি এদের প্রতি কিছু নিক্ষেপ করে…এখন এর মানে কী? কুরআন হলো আবলাগুল কালাম। আমি আমার খুৎবার আরবি অংশে যেমন বলেছিলাম। সবচেয়ে আলঙ্কারিক, সবচেয়ে নিখুঁত বক্তব্য। আল্লাহ বলতে পারতেন, আল্লাজিইনা ইয়াত্তাহিমুওনাল মুহসানাত বিয জিনা- যারা নারীদের বিরদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ আরোপ করে। আওদাহ। এটা আরও বেশি স্পষ্ট। কিন্তু, তিনি এটা বলেননি। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা তাঁর বক্তব্যে খুবই সুনির্দিষ্ট। মানুষ তো আর একজন নারীর কাছে গিয়ে বলবে না যে সে ব্যভিচার করেছে। তারা এভাবে কানাঘুষা করবে- “ঐ যে ঐ মেয়েটা আমি নিশ্চিত না। আমার মনে হয় সেদিন আমি তাকে অমুক ছেলের সাথে দেখেছি। আমি জানি না তারা কী নিয়ে কথা বলছিল।” শুধু এতোটুকু। শুধু এতোটুকু বললেই আপনি অপরাধী।

জানেন? মানুষ কী করে? সবচেয়ে জঘন্য কিছু বলার আগে…আমি বলছি না যে সে…কিন্তু… যখনই আপনি বলেন- আমি বলছি না যে…তার মানে আপনি সবচে জঘন্য কিছু বলতে যাচ্ছেন। যদি কিছু না বলতেন কতই না ভালো হত। কিন্তু আপনি বলছেন।

আর মানুষ যখন এমনটা করে, বাজে মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়…ঐ যে ঐ দুইটা। আমি জানি না ওদের ভেতর কী হচ্ছে। daal me kuch kala hai kuch chakkar chal raha hai. কিছু একটা হচ্ছে। আমার মনে হয় আমি কিছু টেক্সট মেসেজ দেখেছি। আমি তাকে ফোনে কথা বলার সময় হাসতে দেখেছি। এই হাসার মানে কী। তারা এতো কাছাকাছি কেন দাঁড়িয়ে আছে। অমুকটা হচ্ছে কেন তমুকটা হচ্ছে কেন?

শুধু এই মন্তব্যগুলো!! শুধু এমন ইঙ্গিতপূর্ণ কথাগুলো!! এগুলোই যথেষ্ট ‘ইয়ারমুওনাল মুহসনাতের’ ভেতরে পড়ে যাওয়ার জন্য। কারণ, আল্লাহ ভাষাটা খোলা রেখেছেন। আপনি হয়তো একেবারে স্পষ্টভাবে তাদের প্রতি অভিযোগ আরোপ করেননি। আপনি জাস্ট ঐ দিকে কিছু কথা ছুঁড়ে দিয়েছেন। আর বাকিটা শয়তান এবং আপনার কল্পনার কাজ।

কারণ, আপনি যখন বলেন আমি কিছু বলছি না, কিন্তু ঐ দুইটা… আমি জানি না। এরপর পরের জন বলবে- আমি জানি না আপনি শুনেছেন কিনা। কিন্তু, জানেন? আমি কী শুনেছি? ঐ দুইজন… আমার মনে হয় তারা দুইজন…এরপর ব্যাপারটা খারাপ থেকে আরও খারাপ হতে থাকে। সবাই বলছে, আমি কিছু বলছি না। আর সবাই বলছে কাউকে কিছু বলতে যেও না। কিন্তু, সবাই এটা নিয়ে কথাবলছে। আর সবাই সবাইকে বলছে আর কাউকে বলবেন না। হা হা।

এরপর কী ঘটে? একটি সমগ্র পরিবারের মান-মর্যাদা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। একজন নারীর মর্যাদা ধ্বংস হয়ে গেছে, যার বিরুদ্ধে আপনার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু, আমি তাদেরকে মার্কেটে দেখেছি। সত্যিই? “সুম্মা লাম ইয়া’তি আরবাআতি শুহাদা”। যদি আপনি কারো বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আরোপ করেন কিন্তু চারজন সাক্ষী জোগাড় করতে পারেননি। “অতপর তারা চারজন সাক্ষী নিয়ে আসেনি।”

ইসলামী আইনবিদেরা আরও বর্ণনা করেছেন- সিনেমা হলে তাদের দু’জনকে একসাথে দেখার চারজন সাক্ষী আনলে হবে না। বা শপিং মলে একসাথে ঘুরতে দেখলেও হবে না। অথবা, একই দিকে যেতে দেখলেও হবে না। না, না, না।

যদি চারজন সাক্ষী তাদেরকে চূড়ান্ত পাপ করতে না দেখে, তাদের নিজেদের চোখ দিয়ে, যদি এটা তারা না দেখে থাকে, তাহলে এই অভিযোগকারীদেরকেই ৮০ বার চাবুক পেটা করো।

মানুষের মর্যাদা নিয়ে কোনো ধরণের চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই বাজে মন্তব্য করার পরিণতি কী ভয়ঙ্কর তা বুঝার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে একজন মুসলিম নারীর মর্যাদা। এর গম্ভীরতা বুঝার চেষ্টা করুন। জনসম্মুখে জিনাকারীদের শাস্তির পাশেই আল্লাহ এদের শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন!!

আমি এ কথাটির মাধ্যমে সমাপ্তি টানছি। আমি চাই আপনারা এটা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করুন। আল্লাহ যখন জনসম্মুখে জিনাকারীদের বা ব্যভিচারীদের কথা বর্ণনা করেছেন, এর শেষে কি আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমার দরজা খুলে দিচ্ছেন না? আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলছেন যে, তাদের শাস্তি দিতে হবে কিন্তু মুমিনরা ইতোমধ্যে তাদের জন্য অন্তরে দয়া অনুভব করে, মুমিনদের একটি দল যেন এটা পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের জন্য দোআ করতে পারে, এটাই এখানে ইঙ্গিত।

কিন্তু যখন অভিযোগকারীদের কথা আসলো- যারা অন্যদের প্রতি অভিযোগ ছুঁড়ে দেয়, যারা অপবাদজনক মানহানিকর মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়…বা বলে যে, না, আমরা তো আর অভিযোগ করছি না। তারা এমনকি কিছু বলে না শুধু জিজ্ঞেস করে। আর এটা ভালো একটা কৌশল। “আমি তো আর কিছু বলছি না। আমি শুধু জানতে চাইছি।” “তোমার কি মনে হয় এ দুজনের মধ্যে কিছু একটা ঘটে চলছে?” শুধু এটুকুই। প্রশ্ন করাটাও ছুঁড়ে দেয়ার পর্যায়ে পড়ে যায়। যখন শুধু এতোটুকু করেন, আল্লাহ এ মানুষদের সম্পর্কে কী বলেছেন?

শুধু চাবুক পেটা নয়, তিনি আরও বলেন- ” – وَّ لَا تَقۡبَلُوۡا لَهُمۡ شَهَادَۃً اَبَدًا – (ওয়া লা তাকবালু লাহুম শাহাদাতান আবাদান) “তোমরা কখনই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না।” এ মানুষগুলোর কোনো সাক্ষ্য আর কোনোদিন গ্রহণ করে নিও না।

ইয়া আল্লাহ! এটা তো আরও ভয়ংকর শোনা যাচ্ছে! এটাই শেষ নয়। তদুপরি – وَ اُولٰٓئِکَ هُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ – “আর এরাই হলো চূড়ান্ত নীতিভ্রষ্ট।”

আল্লাহ এ কথা এমনকি ব্যভিচারীদের সম্পর্কেও বলেননি। তিনি তাদের সম্পর্কে বলেননি- وَ اُولٰٓئِکَ هُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ – কিন্তু এদের সম্পর্কে বলেছেন- وَ اُولٰٓئِکَ هُمُ الۡفٰسِقُوۡنَ –

প্রশ্ন হলো কেন এদের চাবুক পেটা করা হচ্ছে? এটাই খুৎবার শেষ কথা। কেন এদের চাবুক পেটা করা হচ্ছে?

কারণ, আপনি যখন এরকম মন্তব্য ছুঁড়ে দেন, আপনিও সমাজ নষ্ট করছেন। মনে আছে? আমি যে বলেছিলাম- আল্লাহ এই দুনিয়াতে শুধু এমন অপরাধের শাস্তি প্রদান করেন যা সমাজ নষ্ট করে ফেলে। যা অন্যদের ক্ষতি সাধন করে। আপনি যখন একজন মুসলিমের সম্মান নষ্ট করেন, মুসলিম পুরুষের বা মুসলিম নারীর, আপনি যখন তাদের মর্যাদা হানি করেন- এটা এই পৃথিবীতেই একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, শুধু আখেরাতে নয়। খুবই সিরিয়াস একটা ব্যাপার!

ইজ্জত! ইকরাম! আভিজাত্য! একজন মুসলিমের মান-সম্মান! আল্লাহর নিকট খুবই বড় একটা বিষয়। আল্লাহ এটাকে সুনির্দিষ্ট করে আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন- وَ لِلّٰهِ الۡعِزَّۃُ وَ لِرَسُوۡلِهٖ وَ لِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ – “সকল মর্যাদা তো আল্লাহর, তাঁর রাসূলের ও মুমিনদের।” (৬৩:০৮)

আল্লাহ মুসলমানদের এটা দান করেছেন। আপনি আমি এটা কেড়ে নিতে পারবো না, যা আল্লাহ দান করেছেন। এটা এমন কিছু যা আল্লাহ দান করেছেন। আমাদেরকে এটা রক্ষা করতে হবে। আমরা আমাদের জিহ্বা দিয়ে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক কিছু করে ফেলতে পারি।

যখন সন্দেহ তৈরি হয়, তখন শুধু আল্লাহর এ কথাগুলো স্মরণ রাখুন- اجۡتَنِبُوۡا کَثِیۡرًا مِّنَ الظَّنِّ ۫ اِنَّ بَعۡضَ الظَّنِّ اِثۡمٌ – “তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ।” (49:12) কোনো কোনো অনুমান খুব ভয়াবহ পাপে পরিণত হতে পারে। ধারণা করা থেকে দূরে থাকো। মানুষকে সন্দেহের ক্ষেত্রে সুবিধা দান করুন।

আপনি ঐ দুইজনকে চিনেন না। তারা পরস্পরের হাত ধরে আছে এবং ওইদিকে হেঁটে যাচ্ছে।
– “ওহ! নিশ্চয়ই তারা বিবাহিত। অথবা তারা হয়তো ভাই-বোন।”
-“না, না। আমার তো মনে হয় না।”

থামুন। বাদ দিন। অন্যদিকে চলে যান এবং ইস্তেগফার করুন। এখানে আপনার মাথা ঘামানোর দরকার নেই। “مِنْ حُسْنِ إسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ” – [haidth link] একজন ব্যক্তির উপর ইসলামের সৌন্দর্যের একটি দিক হলো তার সাথে সম্পর্কিত নয় এমন কাজ সে বর্জন করে চলে। এখানে আপনার হস্তক্ষেপ করার দরকার নেই। এটা নিয়ে কথা বলবেন না।

আমরা দোআ করছি, আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা যেন আমাদের জিহ্বা রক্ষা করেন, অন্তর রক্ষা করেন, পরস্পরের ক্ষতি করা থেকে যেন আমাদের রক্ষা করেন। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা অন্যদের মান-সম্মান নিয়ে কথা বলার সময় সবাধান থাকে। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করুন, যারা শুধু অজুহাত দিয়ে বেড়ায় এবং অজুহাতের পেছনে লুকায়। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদেরকে নিজেদের ভুলগুলোকে ভুল হিসেবেই দেখার সামর্থ্য দান করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সামর্থ্য দান করুন এবং অন্যদের কাছেও যাদের সম্পর্কে আমরা মন্দ কথা বলে ফেলেছি। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা সকল মুসলিমের ইজ্জত রক্ষা করুন, বিশেষ করে এই উম্মার মেয়েদের। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের মায়েদের ইজ্জত রক্ষা করুন, আমাদের স্ত্রীদের, আমাদের কন্যাদের এবং আমাদের বোনদের। আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের সমগ্র পরিবারের মর্যাদা রক্ষা করুন।

এবং আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদেরকে এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে সাহায্য করুন যারা আমাদের চেয়েও আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী হবে।

বারাকাল্লাহু লিই ওয়ালাকুম ফিল কুরআনিল হাকিম। ওয়ানাফা’নি ওয়া ইইয়াকুম বিল আয়াতি ওয়া জিকরিল হাকিম।

Leave a Comment